‘ভাড়ায়’ জেল খাটা,

 ,ঢাকা

এক বছরে টাকার বিনিময়ে অন্যের হয়ে কারাগারে যাওয়া ২৪ জনকে শনাক্ত। একাধিক এনআইডি থাকার বিষয়টিও ধরা পড়েছে।জমির আলী পরিচয়ে এক ব্যক্তি সুনামগঞ্জের আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। পরে কারাগারের কর্মকর্তারা জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) সংরক্ষিত আঙুলের ছাপের সঙ্গে আসামির আঙুলের ছাপ মেলাতে গিয়ে বুঝতে পারেন, তিনি প্রকৃত আসামি নন। তিনি টাকার বিনিময়ে ভুয়া আসামি সেজে কারাগারে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। ... আরও পড়ুন..................................





জমির আলী সেজে কারাগারে যাওয়া এই ব্যক্তির প্রকৃত নাম মো. আবু সামা। ভুয়া তথ্য দেওয়ার দায়ে আদালত তাঁকে কারাদণ্ড দেন।সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের জেলার হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ যখন গ্রেপ্তার করে, তখন তিনি (আবু সামা) মিথ্যা পরিচয় দিয়ে থাকতে পারেন। আবার অন্য সময়ও পরিচয় বদল হতে পারে। কিন্তু কারাগারে আঙুলের ছাপ যাচাইয়ের পদ্ধতি থাকায় বিষয়টি খুব সহজেই ধরা পড়ে।শুধু সুনামগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন কারাগারে এমন ‘ভাড়ায় খাটা’ বন্দীর তথ্য মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে আসছে।


২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকৃত অপরাধীর পরিবর্তে জেল খাটা ২৪ ভুয়া বন্দীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া কারাগারে এমন ২৯০ বন্দীকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাঁরা একাধিক এনআইডি ব্যবহার করে একাধিকবার কারাগারে ঢুকেছেন। পাঁচটি এনআইডি ব্যবহার করে একই ব্যক্তির পাঁচবার কারাগারে ঢোকার বিষয়টিও প্রিজন ইনমেট ডেটাবেজ সিস্টেমের (পিআইডিএস) মাধ্যমে ধরা পড়েছে।

বন্দীর তথ্য-উপাত্ত যাচাইসহ (বায়োমেট্রিক ক্রস ম্যাচিং) নিবন্ধন করে রাখার জন্য দেশের সব কারাগারে পিআইডিএস স্থাপন করা হয়েছে। পিআইডিএস স্থাপনের কাজটি করেছে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)।


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পিআইডিএসে সব বন্দীর ব্যক্তিগত তথ্য, অপরাধের ধরন, অতীতের কর্মকাণ্ড, বন্দীকে কারাগারে দেখতে আসা ব্যক্তিদের তথ্য (ভিজিটর হিস্ট্রি) ইত্যাদি দেড় শতাধিক তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। এ ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ জেল ডেটাবেজের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।এনটিএমসির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, পিআইডিএসের মতো তথ্যভান্ডার তৈরি করার ফলে কারাগারে প্রকৃত অপরাধী ও ভুয়া বন্দী শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।


অন্যদিকে পিআইডিএসের মাধ্যমে দ্বৈত বা একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা বন্দীদেরও শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির ১০ আঙুলের ছাপ, আইরিশ স্ক্যান ও ছবি তোলার মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণের ফলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গতিবিধি খেয়াল রাখা যাচ্ছে।


একজনের বদলে আরেকজনের ভাড়ায় জেল খাটার ঘটনা বেশি ঘটেছে চট্টগ্রামে, ১৫টি। চেক প্রত্যাখ্যানের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত চট্টগ্রামের বাঁশখালীর নাছির আহমদের বদলে জেল খাটেন ঢাকার সাভারের মজিবুর রহমান। এর বিনিময়ে তিনি পান তিন হাজার টাকা। অবশ্য বেশি দিন কারাবাস করতে হয়নি মজিবুরকে। আঙুলের ছাপ পরীক্ষার সময় ধরা পড়েন তিনি।


জামিনে থাকা মজিবুর সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কোনো মামলার আসামি ছিলাম না। প্রকৃত আসামি নাছির আহমদের পক্ষে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছি স্বেচ্ছায়। বিনিময়ে নাছিরের কাছ থেকে তিন হাজার টাকা নিয়েছি। তিনি আমার দোকানে চা খেতে আসতেন, তখন পরিচয়।’


একইভাবে মিনু মারমার বদলে পাইনু প্রু মারমা কারাগারে যান, শফিকুল হাওলাদারের বদলে রফিকুল আহমেদ ইসমাইল, মো. ইউসুফের বদলে শহিদুল ইসলাম, নাসিমা বেগমের বদলে খতিজা বেগম, সেনোয়ারা বেগমের বদলে মনিরা বেগম, আব্দুল করিমের বদলে আবদুল কাদের, বাবুলের বদলে সাইফ উদ্দীন মোহাম্মদ, নজরুল ইসলামের বদলে আরিফুল ইসলাম, দিদারুল আলমের বদলে কামাল হোসেন, সেলিম উদ্দীনের বদলে আবু নাসের, রুবি আক্তারের বদলে কুলসুমা বেগম, মো. সোলেমানের বদলে সরোয়ার, তানিয়া আক্তারের বদলে বুলু আক্তার প্রমুখ কারাগারে যান।


এ ছাড়া তারেক সরদারের হয়ে রাজবাড়ী জেলা কারাগারে যান এরশাদ সরদার, দিনাজপুর জেলা কারাগারে সাজ্জাদ হোসেনের বদলে যান তাপস কুমার সরকার, চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে জাহিদুল ইসলামের বদলে মনিরুল ইসলাম, খায়রুল বারী মিঠুর বদলে আরমান হোসেন লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে ঢোকেন। কারা সূত্র জানায়, এঁরা সবাই ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে কারাগারে গিয়েছিলেন।


চাঁদাবাজির অভিযোগে করা এক মামলায় ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ করেন ইব্রাহীম খান ওরফে ভাগিনা তুষার। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আদালতে ইব্রাহীম সেজে আত্মসমর্পণ করেছিলেন সাইফ ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তি। বিষয়টি ধরা পড়ে সাইফের জামিন হওয়ার পর। কারা সূত্র জানায়, চাঁদাবাজির একটি মামলার আসামি ইব্রাহীম। একইভাবে মো. সজীব (সাগর মোল্লা) নামের এক আসামির বদলে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে যান উজ্জ্বল মণ্ডল, হামিদ খানের বদলে সোহেল হোসেন রুবেলসহ বেশ কয়েকজন।


 ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার সুভাষ কুমার ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এমন বেশ কয়েকজনকে পেয়েছি। যে কারও জামিনের কাগজ পাওয়ার পর আমরা যখন বন্দীদের মুক্তি দিই, তখন বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপ নিই। কয়েকজনের আঙুলের ছাপ না মেলায় আমরা বুঝতে পারি, তাঁরা প্রকৃত আসামি নন। টাকার বিনিময়ে তাঁরা কারাবাস করেছেন। আমরা তাঁদের আদালতে ফেরত পাঠিয়েছি।’


কক্সবাজারের সাইদুল হোসেনের বদলে শাহজাহান শামীন নামের এক ব্যক্তি ভাড়ায় জেল খাটতে কারাগারে যান। পরে তাঁর আঙুলের ছাপ মেলাতে গিয়ে ভিন্ন নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়। এনটিএমসির নথিতে বলা হয়েছে, সাইদুল ও শাহজাহান একে অপরের আত্মীয় এবং ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে শাহজাহান কারাগারে গিয়েছিলেন।

কক্সবাজার কারাগার সূত্রে জানা গেছে, ইমাম হোছাইন ইয়াবা ব্যবসায়ী। তিনি ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। তবে কক্সবাজার কারাগারে ঢোকেন মো. বাচ্চু মিয়া নামের আরেকজন। আঙুলের ছাপ মেলাতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে ইমাম হোছাইনকে কারাগারে পাঠানো হয়।


জানতে চাইলে কক্সবাজারের মো. শাহ আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুটো বিষয় জানার পর আমরা ভুয়া আসামিদের আদালতে পাঠিয়েছি। পরে আদালত তাঁদের শাস্তিও দিয়েছেন। এখানে কারাগারের কোনো ত্রুটি নেই; বরং কারাগারে আসার পরই জানতে পেরেছি, তাঁরা প্রক্সি দিচ্ছেন।’


কারা কর্মকর্তারা জানান, কারাগারে বন্দী আসেন ওয়ারেন্ট কার্ডসহ। এরপর কারাগারের সংস্থাপন শাখা থেকে তাঁর তথ্য ও ছবি সংরক্ষণ করে ‘কেস কার্ড’ তৈরি করা হয়। প্রত্যেক বন্দীকে পিআইডিএসের মাধ্যমে ছাড়পত্র নিয়ে কারাগার ছাড়তে হয়। বন্দীর কারাগারের নিবন্ধন নম্বরের পাশাপাশি পরিচিতি (আইডেনটিফিকেশন) নম্বর করা হয়। বন্দীর ১০ আঙুলের ছাপ সরাসরি এনআইডি সার্ভারের সঙ্গে ক্রস ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে ‘ভেরিফায়েড প্রোফাইল’ সংরক্ষণ করা হয়।


পিআইডিসে ঢুকে সহজেই যেকোনো কারাবন্দীর সব তথ্য পাওয়া যায়। এ পর্যন্ত পিআইডিএসে ১০ লাখের বেশি আসামির তথ্য সংরক্ষিত আছে।

একাধিক এনআইডি থাকার বিষয়টি বন্দীদের নিবন্ধন করার সময় এনআইডি ডেটাবেজ থেকে তথ্য মেলানোর সময় ধরা পড়ে। এর মধ্যে ১১ জন দুই দফায় কারাগারে গেছেন। তিনবার তিন এনআইডি ব্যবহার করে কারাগারে গেছেন পাঁচজন। চার ও পাঁচবার যথাক্রমে চার ও পাঁচটি এনআইডি ব্যবহার করে কারাগারে গেছেন দুজন।